
নিজস্ব প্রতিবেদক।।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বের অন্তর্বর্তী সরকার আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হওয়ার ঘোষণা দিলেও আবার দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। এরই মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন শর্ত দিয়ে আন্দোলনে নামার হুমকি দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। আর তাদের মুখোমুখি পাল্টা অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, যারাই নির্বাচন ভণ্ডুলের চেষ্টা করবে তারাই জাতীয় রাজনীতি থেকে মাইনাস হবে। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেছেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যই মানুষ আন্দোলন, সংগ্রাম করে আজকের এই পর্যায়ে এসেছে। ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে বলেও মন্তব্য করেন সালাউদ্দিন আহমদ।
আর এ কারণেই যখন অন্তবর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ভোটের সুনির্দিষ্ট সময় ঘোষণা দিয়ে প্রস্তুতির চেষ্টা চলছে, তখন বিএনপি ও জামায়াতসহ বর্তমানে সক্রিয় কয়েকটি রাজনৈতিক দলের একে অপরের বিরোধিতার মুখে নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ, সংশয় বাড়ছে।
নির্বাচন নিয়ে জামায়াত ও এনসিপির নেতারা বলছেন, সংস্কার ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচারের বিষয় পাশ কাটিয়ে একটি 'সাজানো' নির্বাচন করা হচ্ছে। এটা তারা মানবেন না। এর আগেই সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবের জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে শর্ত দিয়ে জামায়াত, এনসিপি এখন বিএনপির পাল্টা বা বিপরীত অবস্থান নিয়েছে। এসব কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর মতপার্থক্য, বিভক্তি বাড়ছে। এ অবস্থায় নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা ক্রমেই বাড়ছে। কারণ জামায়াত, এনসিপি নির্বাচন বর্জন করলে সেই ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে না। ফলে এ নির্বাচনটি ২০১৮ সালের মতো পাতানো নির্বাচনের তকমা দিয়ে প্রশ্নবদ্ধি করা হবে। এতে বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। এদিকে সিঙ্গাপুরভিত্তিক চ্যানেলনিউজএশিয়া (সিএনএ) টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, নির্বাচন যদি বৈধ না হয়, তাহলে এর কোনো অর্থ নেই। আমার কাজ হলো এমন একটি গ্রহণযোগ্য, পরিষ্কার ও আনন্দদায়ক নির্বাচন নিশ্চিত করা। তার মানে বিষয়টি এখন পরিষ্কার। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের সম্ভাবনা নাই।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো আসলে দেশপ্রেমিক নয়। তাদের সবার লক্ষ্যই হচ্ছে ক্ষমতা। দেশগড়া নয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেকে বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর বিরোধী দল-মতগুলো গা ঝাড়াি দিয়ে উঠে যে যারমতো চলে যেখানে সেখানে মব সৃষ্টি করছে। চাঁদাবাজি, ধান্দাবাজিসহ এমন কোনো অপরাধ নাই, তারা এরই মধ্যে করেনি। এখন নির্বাচন দিলে হয়তো একটি নির্বাচিত সরকার আসবে। তাতে যেমন দেশের কল্যাণ হবে না আবার না দিলেও বর্তমান গুমোট পরিবেশ বা অস্থিরতা কাটবে না। অর্থাৎ দেশ এখন উভয় সংকটে।
জামায়াত ও এনসিপি চাইছে পিআর পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ। কিন্তু বিএনপি এ দাবির বিরুদ্ধে। নির্বাচন নিয়ে মূলত: এ নিয়েই তাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব। তাই জামায়াত, এনসিপি নির্বাচনের আগেই সংস্কার প্রশ্নে জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের শর্ত বা দাবি তুলেছে। এমনকি জাতীয় সংসদের চলমান নির্বাচনের পদ্ধতি পাল্টিয়ে ভোটের আনুপাতিক হার বা পিআর পদ্ধতি চালু করার দাবিকেও সামনে আনছে দলটি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত পদ্ধতিতে ভোট হলে এনসিপি ও জামায়াত খুব বেশি কায়দা করতে পারবে না। কারণ বিগত দিনগুলোতে জামায়াত ভোটে তেমন ভালো ফলের ইতিহাস নেই। আর এনসিপি তো নতুন। শুরু থেকেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নাই। তাছাড়া বিবিসির জরিপেও তাদের অবস্থান দুর্বল। তাই এখন ভোট হলে এনসিপি হারিয়ে যাবে। আর নির্বাচনের পর এসব দলের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না বলেও মনে করেন অনেকে। তাই নানা ধুয়া তুলে নির্বাচনকে পিছিয়ে দিয়ে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চাইছেন এই নেতারা। যদিও এসব যুক্তি অস্বীকার করছে এনসিপি ও জামায়াত। তারা বলছে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করে পিআর বা আনুপাতিক হারে নির্বাচন হলে সবার জন্য ভোটের উপযুক্ত পরিবেশ হবে।
এসব কারণে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে, জামায়াত ও এনসিপি এখন যেসব শর্ত দিয়ে আন্দোলনের কথা বলছে, তারা তাদের শর্ত বা দাবি আদায়ে কতদূর যেতে পারে, তারা কি নির্বাচন বর্জনের মতো অবস্থানে যেতে পারে? নাকি তাদের মনে অন্য কোনো লক্ষ্য আছে? বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। তবে জামায়াত, এনসিপির সূত্রগুলো বলছে, দাবি বাস্তবায়নের জন্য তারা রাজপথে সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি নিতে পারে।
আগে থেকেই নির্বাচনের সময় নিয়ে বিএনপির সঙ্গে জামায়াত ও এনসিপির মতপার্থক্য রয়েছে। যেমন বিএনপি নির্বাচন চায় অবিলম্বে কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন করার কথা বলে আসছিলেন।
এরপর নির্বাচন ইস্যুতে সরকারের সঙ্গেও বিএনপির সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয়। কারণ বিএনপি এ বছরের ডিসেম্বরেই নির্বাচনের জন্য সরকারের ওপর চাপ তৈরির পরিকল্পনা করছিল। সেই পরিস্থিতিতে গত ১৩ জুন ড. ইউনূসের সঙ্গে লন্ডনে তারেক রহমানের বৈঠকের পর সরকারের অবস্থান বদলে যায়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যদিও এই বৈঠক করার পর ড. ইউনূসের ওপর নাখোশ হয়েছিল জামায়াত ও এনসিপি।
