
নিজস্ব প্রতিবেদক।।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জামায়াতে ইসলাম, বিএনপি ও এনসিপির সম্পর্ক একই সূতোয় গাঁথা থাকলেও সময়ের স্রোতে সেই সুসম্পর্কে এখন ছেদ পড়েছে। এখন স্বার্থের দ্বন্দ্বে এসব দলের নেতারা বিভিন্ন সময় একে অন্যের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতেও কার্পণ্য করছেন না। সম্প্রতি জামায়াতের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় এসেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
নিজের ফেসবুক পোস্টে গত ১৯ অক্টোবর নাহিদ বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর কথিত সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের বা (পিআর) আন্দোলন একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশনের সংস্কার প্রক্রিয়া এবং জাতীয় সংলাপকে গণঅভ্যুত্থানের আলোকে সংবিধান ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রকৃত প্রশ্ন থেকে ভিন্ন দিকে সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে এটা করা হচ্ছে। আর এই কথায় চটেছে জামায়াত ইসলামও। জামায়াত বলছে- নাহিদ ইসলামের ফেসবুক পোস্ট ‘অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর’। রোববার রাতে এক বিবৃতিতে দলটি বলেছে, নাহিদ ইসলামের কাছ থেকে বালখিল্য বক্তব্য জাতি আশা করে না।
আর এক সময়ের ঘনিষ্ঠু দুই দলের মধ্যে এখন বৈরী সম্পর্ক দেখা দেওয়ায় রাজনৈতিক সচেতনদের মধ্যে নানান প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
তারা বলছেন, গত এক বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দলের মধ্যে ‘সুসম্পর্ক’ দেখা গেলেও এখন জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করা না করার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর লক্ষ্যই হচ্ছে নির্দিষ্ট স্বার্থ বা ক্ষমতা। এই ক্ষমতা লাভের প্রশ্নে এরা সবকিছুই করতে পারে। সুতরাং আজকে এনসিপির সঙ্গে জামায়াতের দূরত্ব দেখা দিলেও কিছুদিন পর তা না-ও থাকতে পারে।
এনসিপির অবস্থান হচ্ছে, আইনি ভিত্তি নিশ্চিত হওয়ার আগে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে না দলটি। আর আগে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে গেলেও তারা তাতে স্বাক্ষর করবে না। কিন্তু শেষমেষ জুলাই সনদে সই করে আগের দেওয়া সেই কথায় স্থির থাকেনি দলটি। শুধু তাই নয়, গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, গত ১৭ অক্টোবর সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের দিন জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে ফোন করে অনুষ্ঠানে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সেই অনুরোধ রাখেনি এনসিপি। ওইদিন এনসিপি বাদে বিএনপি ও জামায়াতসহ ২৪টি দল সনদে সই করে।
এদিকে নাহিদ ইসলাম জামায়াতকে লক্ষ্য করে আরো বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনে পিআর পদ্ধতিতে ভোট করার যে আন্দোলন জামায়াত এখন করছে, তা ‘কথিত’ আন্দোলন । তিনি লিখেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের আগে ও পরে কখনোই সংস্কার আলোচনায় জামায়াত যুক্ত হয়নি । তারা কোনো কার্যকর প্রস্তাব দেয়নি, কোনো সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গিও উপস্থাপন করেনি এবং গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের প্রতি কোনো অঙ্গীকারও দেখায়নি।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের অধীন সংস্কারের বিষয়ে জামায়াত আকস্মিক যে অনুমোদন দিয়েছে, সেটা সংস্কার আকাঙ্ক্ষার ফল নয়; বরং একটি কৌশলগত অনুপ্রবেশ। সংস্কারবাদের ছদ্মবেশে এটি একটি রাজনৈতিক অন্তর্ঘাত। এনসিপির শীর্ষ নেতাদের কেউ এর আগে প্রকাশ্যে জামায়াতের তীব্র সমালোচনা করেননি।
সনদ স্বাক্ষরের দিন ‘জুলাইযোদ্ধা’দের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় নাহিদ ইসলাম বলেছেন, সংসদ ভবনের সামনে আহত জুলাইযোদ্ধাদের ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের অনুসারী হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। এই বক্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করে আহত যোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
এর আগে সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছিল জামায়াত। আর অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি।
রাজনৈতিক সচেতনরা বলছেন, বাংলাদেশ এখন আর কোনো ফর্মুলার মধ্যে চলছে না। কারণ সরকার এক পথে আর রাজনৈতিক দলগুলো একেক সময় একেক পথে হাঁটছে। ফলে এর শেষ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটা ভবিষ্যতই বলে দিবে।
