
এসবিবাংলা আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন অভিবাসন নীতির ফলে গত ১১ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ১৬ লাখেরও বেশি অভিবাসী তাদের বৈধ মর্যাদা হারিয়েছেন। এই সংখ্যা ফিলাডেলফিয়ার জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। আর এই প্রক্রিয়া একটি আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অভিবাসীদের আইনি সুরক্ষা বাতিলের সবচেয়ে বড় অভিযান বলে উল্লেখ করেছে CBS News ও The New York Times।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই বৈধ মর্যাদা হারানোদের মধ্যে রয়েছেন ভিসা, আশ্রয়-asylum, পারোল, ও Temporary Protected Status -TPS–এর আওতায় থাকা অভিবাসীরা। এদের অনেকেই বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাস করছিলেন।
অভিবাসন সংগঠন FWD.us–এর সভাপতি টড শুল্টে বলেন, “এই মানুষগুলো সরকারের নিয়ম মেনে এসেছিলেন। কিন্তু সরকার এখন নিজেই তাদের আইনি মর্যাদা বাতিল করে দিয়েছে। ইতিহাসে এর কোনো নজির নেই।” তিনি আরও বলেন, “কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট, রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট—কেউই এত বড় পরিসরে কর্মসংস্থান ও আইনি অনুমোদন কেড়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেননি।” বহু অভিবাসী এখন উদ্বেগে আছেন, কারণ তাদের মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
U.S. Citizenship and Immigration Services (USCIS)–এর মুখপাত্র ম্যাথিউ ট্রাগেসার এক বিবৃতিতে বলেন, “আমেরিকান করদাতাদের ওপর অবৈধভাবে থাকা বিদেশিদের আর্থিক বোঝা আমরা আর চাপিয়ে দেব না।” প্রশাসন বলছে, অভিবাসন আইন কঠোরভাবে কার্যকর করে তারা দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে চায়।
এদিকে সম্প্রতি Homeland Security Secretary ক্রিস্টি নোম ঘোষণা দিয়েছেন, “Diversity Visa Lottery Program” আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। তার দাবি, গত বছর একটি গুলিবর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত এক ব্যক্তি ২০১৭ সালে এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। যদিও এই সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা নাগরিকদের ওপর প্রভাব ফেলছে না, তবে ভবিষ্যতের জন্য এটি এক অনিশ্চিত দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে CBS News বলছে, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের এমন একটি পদক্ষেপ যা বৈধ ও অবৈধ উভয় ধরনের অভিবাসন সীমিত করার প্রচেষ্টার অংশ। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত Homeland Security Department অন্তত ১০টি দেশের TPS প্রোগ্রাম বন্ধ করেছে।
এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে—সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা, হাইতি, নিকারাগুয়া, সুদান, ইয়েমেন, সোমালিয়া ও লেবানন।
এই সিদ্ধান্তের ফলে শুধুমাত্র সিরিয়ার ৩,৮০০ জন নাগরিক তাদের বৈধ অবস্থান হারিয়েছেন। তবে ভেনেজুয়েলার TPS বাতিল হলেও আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে কিছু মানুষ ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বৈধ মর্যাদা ধরে রাখতে পারছেন।
Temporary Protected Status-TPS হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর নাগরিকরা অস্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় পেতে পারেন।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, এই প্রোগ্রামগুলো মূলত “অস্থায়ী” ছিল এবং এখন শেষ করার সময় এসেছে। এছাড়া প্রতিটি বাতিলের সঙ্গে ৬০ দিনের সময়সীমা ও ১,০০০ ডলার প্রণোদনা বা self-deportation offer দিয়েছে প্রশাসন। যাতে তারা স্বেচ্ছায় দেশ ত্যাগ করেন। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, সরকার এমন কোনো তথ্য দেখাতে পারেনি যা প্রমাণ করে—এই দেশগুলোর পরিস্থিতি উন্নত হয়েছে।
সিবিএস নিউজের খবরে বলা হয়েছে, এই বছর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বিভিন্ন কারণে ৮৫ হাজার ভিসা বাতিল করেছে। যার মধ্যে ৮,০০০–এর বেশি ছাত্র ভিসা। এর মূল কারণ হিসেবে বলা হয়েছে হয়েছে—মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, আক্রমণ ও চুরি করার মতো অপরাধ।
একই সঙ্গে বাতিল করা হয়েছে ১৪,০০০ মানুষের Family Reunification Parole Program কর্মসূচি। যা মূলত মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার পরিবারগুলোর জন্য চালু ছিল।
The New York Times বিশ্লেষণে বলছে, “ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বৈধ ও অবৈধ অভিবাসন দুটোই সীমিত করার সবচেয়ে বড় উদ্যোগ নিয়েছে। এটি শুধু নীতির পরিবর্তন নয়, বরং আমেরিকার মানবিক মূল্যবোধেরও বড় পরীক্ষা।” প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইনি মর্যাদা হারানো অভিবাসীদের অনেকেই এখন আদালতে মামলা করছেন এবং আগামী বছর এ বিষয়ে ব্যাপক আইনি লড়াই শুরু হতে পারে।
