
নিজস্ব প্রতিবেদক।।
মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের ঢল বাংলাদেশে নির্বিঘ্নে প্রবেশ করে কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়ে বছরের পর বছর বিদেশি সাহায্যে খাবারসহ সব ভরণপোষণ পেলেও সেই সুযোগ আর থাকছে না। এরই মধ্যে অর্থ সাহায্য কমিয়ে অর্ধেকে নামিয়ে দিয়েছে দাতা দেশগুলো। আর এ কারণে বন্ধ হয়ে গেছে বিভিন্ন দাতা সংস্থায় পরিচালিত অনানুষ্ঠানিক ৬ হাজার ৪০০ স্কুল। যেসব স্কুলে রোহিঙ্গা শিশুরা নিয়মিত পড়াশোনা করার সুযোগ পেত।
আর এর ফলে এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে ৪ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শিশুর শিক্ষাজীবন।
ইউনিসেফ ও সেভ দ্য চিলড্রেনের অর্থ সহায়তা ও তত্ত্বাবধানে এই স্কুলগুলো পরিচালিত হতো। তারা গত ৩ জুন কিন্ডারগার্টেন থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ক্লাস স্থগিত করে। এরপর ১ হাজার ১০০ শিক্ষককে ছাঁটাই করে স্কুলগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই স্কুলগুলোতে কর্মরত ৮ হাজার শিক্ষকের মধ্যে ৩ হাজার ৯০০ জন বাংলাদেশি নাগরিক এবং বাকিরা রোহিঙ্গা ছিলেন।
এদিকে হঠাৎ করে চাকরিহারা হয়ে অর্থ সংকটের মুখে পড়েছে এই শিক্ষকরা। তাদেরকে দ্রুত পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে ক্লাস স্থগিত করার পরিবর্তে পাঠের সময় কমিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয়ের তথ্য বলছে, চলতি বছরের শিক্ষাখাতে ৭২ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন রয়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে মাত্র ১০ মিলিয়নেরও কম। অথচ রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী মিলিয়ে—প্রায় ১৫ লাখ মানুষের জন্য মোট বাজেট চাহিদা ৯৩৪ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ১২ জুলাই পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৩০৩ মিলিয়ন ডলার।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক সহায়তায় ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়ায় তহবিলের এই ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
২০১৭ সালে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর এই শিক্ষাকেন্দ্রগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল। ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ১ হাজার মাদরাসা ও ২০০টি কমিউনিটি স্কুল এখনো চালু রয়েছে। স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞানসহ অন্যান্য বিষয় বার্মিজ ভাষায় শেখানো হয়। বাংলাদেশ সরকার ২০২০ সালে মিয়ানমারের স্কুল পাঠ্যক্রম চালু করার অনুমতি দেয়।
বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন ইউকে (BROUK) এর ২০১৮ সালের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, রাখাইন রাজ্যের অনেক রোহিঙ্গা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। ২০১২ সালে রাখাইনে সহিংসতার আগে, তারা সরকারি স্কুলে রাখাইন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পড়তে পারত, এমনকি সিত্তুয়ের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষাও গ্রহণ করত। কিন্তু ২০১২ সালের শেষের দিকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নতুন ঢেউয়ের পর, বহু রোহিঙ্গাকে ‘উন্মুক্ত কারাগারে’ আটকে রাখে মিয়ানমার সরকার। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া বা পড়াশোনা শেষ করার সুযোগ কেড়ে নেওয়া হয়। তারা কেবলমাত্র সংকটাপন্ন ও শিক্ষকসংকটে ভোগা স্কুলগুলোতেই পড়ার অনুমতি পায়। ফলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে নিরক্ষরতার হার ব্যাপক বাড়তে থাকে।
ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নেই সান লুইন বলেন, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর ইয়াঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া ৪৭ জন রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীকে তাদের শিক্ষা চালিয়ে যেতে বাধা দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, বাস্তবে, বর্তমানে কোনে রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার অনুমতি নেই… ভালো মানের শিক্ষা ছাড়া তারা একটি হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।’
