নিজস্ব প্রতিবেদক।।

গত ২৩ আগস্ট ঢাকা সফর করে গেলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তথা উপপ্রধানমন্ত্রী ইশহাক দার। এ সফরের সময় তিনি দেখা করেছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস-সহ অন্য উপদেষ্টাদের সঙ্গে। পাশাপাশি বিএনপি, জামায়াত বা এনসিপি-র শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও দেখা করেছেন ইসহাক দার। ইশহাক দার বাংলাদেশে এসে এও বলেছেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ একাত্তর একটি 'মীমাংসিত বিষয়। বাংলাদেশিদের 'হৃদয় পরিষ্কার করে' সামনে এগিয়ে যাওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। আর এই বিষয়টি মোটেও ভালো ভাবে নেয়নি ভারত। অন্যদিকে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে হাওয়া দিচ্ছে খোদ আমেরিকাও। ফলে ভারত এখন নানা ভাবেই উদ্বিগ্ন।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা বা চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহান গত জুলাইয়ে প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন, চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের (নিরাপত্তা) স্বার্থের ক্ষেত্রে এক ধরনের 'অভিন্নতা' দেখা যাচ্ছে। – ভারতের জন্য যার প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী।
জেনারেল চৌহান বলেন, "এই তিনটি দেশের ক্ষেত্রে যে সম্ভাব্য 'কনভার্জেন্স অব ইন্টারেস্ট' দেখা যাচ্ছে, তা ভারতের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ডায়নামিক্সের ওপর বড় প্রভাব ফেলতেই পারে!"
শুধু তাই নয়, পাকিস্তান যে বৃত্তি দিয়ে বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীদের তাদের দেশে পড়াতে নিয়ে যেতে চাইছে – কিংবা বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে চাইছে – ভারতের জন্য সেটা মারাত্মক দুশ্চিন্তার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও সরকারি নীতি খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সেই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পরিস্থিতি যে বেশ শান্ত এবং স্বশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব যে কমতেছিল, তার পেছনে শেখ হাসিনা সরকারের বড় ভূমিকা ছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর ভারত মনে করছে, এখন এই পরিস্থিতি আবার পাল্টানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
২০০৪ সালে বীণা সিক্রি ঢাকায় ভারতের রাষ্ট্রদূত থাকার সময় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দশটি ট্রাকে করে অস্ত্র পাচারের ঘটনা ঘটেছিল – যা আলফা-সহ ভারতেরই বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর জন্য নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল বলে ধারণা করা হয়।
তাই বীনা সিক্রি মনে করেন, আজকের ঢাকায় ড. ইউনূস ও ইশহাক দারের করমর্দনের যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, সেটা একরকম 'ডেজাঁ ভু' মোমেন্ট। – কারণ ভারত অবিকল এই ধরনের পরিস্থিতি আগেও পার করেছে। বিবিসি বাংলাকে সাবেক এই কূটনীতিক বলেছেন, "সে সময় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জঙ্গিরা বাংলাদেশের মাটিতেই ঘাঁটি তৈরি করে তৎপরতা চালাত। তখন বাংলাদেশ সরকারকে বহুবার এই সব প্রশিক্ষণ শিবিরের তালিকা, লোকেশন ও নানা সাক্ষ্যপ্রমাণ দেওয়া হলেও তখনকার বাংলাদেশ সরকার কখনোই এই সব 'জঙ্গি শিবিরের' অস্তিত্ব স্বীকার করেনি। এসব স্বশস্ত্র গোষ্ঠির সাথে বরাবরই পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করে এসেছে ভারত।
কিন্তু ২০০৯ সালের শেষদিকে শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসার পর অরবিন্দ রাজখোয়া বা অনুপ চেটিয়ার মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অনেক শীর্ষ নেতাকেই ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তাই গত এক বছরে বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ ও কর্মকর্তাদের আনাগোনা আবার বেড়ে যাওয়ায় আবার দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে ভারতের নিরাপত্তা নীতি নির্ধারকদের।
