বাণীবিতান ডেস্ক।।
কৈলাশ পর্বত। বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান হলো কৈলাস পর্বত। যাকে বলা হয় স্বর্গ আর মর্ত্যের মিলনস্থল। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শাস্ত্রমতে, তাদের সব দেবতারই বাস ওই কৈলাশ পর্বতে। তাই কৈলাশ পবিত্রতার জন্য পরিচিত। যেখানে কেউ আরোহণ করলে মুহূর্তের মধ্যেই বয়স বেড়ে যায় স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুণ। অথচ এর রহস্য আজো অমীমাংসিত।
হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং শিখ ধর্মের অনুসারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও একটি পবিত্র স্থান কৈলাস পর্বত । বিশ্বাস করা হয় শিব ও পার্বতীর এই পর্বতেই বাস করেন । তাই কৈলাস পর্বত নিয়ে অনেক গভীর রহস্য ও মিথ জড়িয়ে আছে, যা আজো অনাবিষ্কৃত থাকায় এ নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা কৌতুহল রয়ে গেছে বহুদিন ধরে।
জানা গেছে, তিব্বতের পশ্চিম প্রান্তে ২২ হাজার ২৮ ফুট উচ্চতা নিয়ে পিরামিডের মতো দাঁড়িয়ে আছে কৈলাস পর্বত। পর্বতের উপরে স্বর্গ আর নিচে মৃত্যুর স্থান। কৈলাসের মতো রহস্যময় এমন পর্বত পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। কারণ এই পর্বত ঘিরে এমন অসংখ্য বিস্ময়কর ঘটনার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় মানুষ ও তীর্থযাত্রীরা, যার কোনো ব্যাখ্যা মেলে না।
জানা গেছে, কৈলাস পর্বত দিনের বিভিন্ন সময় নিজের রঙ বদলায় নিজের নিয়মে। এসময় বদলে যায় পর্বতটির ভূ-প্রকৃতিও। যাঁরা কৈলাসের আঙিনায় যাঁরা সাহস করে পৌঁছে যান, তাদের শরীরে দ্রুত ফুটে ওঠে বার্ধক্যের ছাপ। অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় তাদের চুল ও নখস। ওই পর্বত থেকে ফিরে আসা তীর্থ যাত্রীরা বলেছেন, কৈলাস পর্বতের গায়ে বরফ ও পাথরের মেলবন্ধনে আঁকা রয়েছে পবিত্র স্বস্তিকা এবং মহাশিবের প্রতীক ওঁম চিহ্ন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পুরাণ অনুযায়ী, কৈলাস পর্বতের চূড়ায় দেবাদিদেব মহাদেবের আবাস। যেখানে বসে তিনি গোটা বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, ধ্বংস, সংহার ও প্রলয় নিয়ন্ত্রণ করেন। গুগল আর্থের তোলা একটি ছবিতে দেখা গেছে, আলো-ছায়ার খেলায় হাস্যরত শিবের মুখাবয়ব। এতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে মহা শিবের প্রতি বিশ্বাস আরো প্রবল হয়। শুধু তাই নয়, বৌদ্ধদের কাছেও এই কৈলাস পর্বত হচ্ছে- সৃষ্টির প্রাণকেন্দ্র। বজ্রযান শাখার বৌদ্ধরা মনে করেন, কৈলাসের শৃঙ্গে ধ্যানমগ্ন হয়ে আছেন ধ্যানের দেবতা হেরুক চক্রসম্ভার। তাই তিব্বতের বন ধর্মের অনুসারীরা মনে করেন, কৈলাস শৃঙ্গ তাদের আকাশ দেবতা সিপাই মেনের আবাস। কৈলাশ পর্বতকে পবিত্র মনে করেন জৈন ধর্মের অনুসারীরাও। তাদের মতে এই কৈলাস পর্বততে প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভদেব নির্বাণ লাভ করেছিলেন।
এবার বলছি কৈলাশ পর্বতের ভৌগোলিক অবস্থানের কথা:
পৃথিবীর একদিকে উত্তর ও অপরদিকে দক্ষিণ মেরুর অবস্থান। যার মধ্যখানেই রয়েছে রহস্যময় হিমালয় পর্বত। এর কেন্দ্র হলো কৈলাস। বিজ্ঞানীদের মতে, এটাই পৃথিবীর কেন্দ্র। যেখানে এমন একটি কেন্দ্র রয়েছে, যাকে বলা হয় অক্ষমুণ্ডি। অর্থাৎ অক্ষমুণ্ডির অর্থ পৃথিবীর নাভি বা স্বর্গীয় মেরু। সহজ ভাষায় এটিকে ভৌগোলিক মেরুকেন্দ্রও বলা হয়। এটি স্বর্গ এবং পৃথিবীর মধ্যে সংযোগের একটি বিন্দু, যেখানে দশটি দিক মিলিত হয়। যেখানে রয়েছে ১০০টি ছোট পিরামিডের কেন্দ্র । এই পর্বতের গঠন একটি কম্পাসের চারটি বিন্দুর মতো।
নানাবিধ কারণে পর্যটকদের কৈলাস পর্বতে আরোহণ নিষিদ্ধ। পর্বতে মানসরোবর হ্রদ অবস্থিত। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে এর কাছেই কুবেরের শহর। একসময় পবিত্র এই মানসরোবরের অধিকার নিয়ে বেশ দ্বন্দ্ব বৌদ্ধ ও বন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে শুরু হয়েছিল। মিলারেপা ও বনচুংয়ের মধ্যে শুরু হয়েছিল কালা জাদুর লড়াই। তখন কথা ছিল, যিনি জিতবেন, তিনিই পাবেন মানসরোবরের অধিকার। কিন্তু তাদের মধ্যে লড়াই হলেও কেউ কাউকে হারাতে পারেননি। তখন লড়াইকারীরাই ঠিক করেছিলেন যে, যিনি আগে কৈলাস শৃঙ্গে পা রাখবেন তার দখলে থাকবে মানসরোবর। এরপর মিলারেপা ও বনচুং পৌঁছে গিয়েছিলেন কৈলাস পর্বতের পাদদেশে। এক পর্য়ায়ে বনচুং পৌঁছে গিয়েছিলেন শৃঙ্গের কাছাকাছি। তখনও ধ্যানমগ্ন হয়ে বসেছিলেন মিলারেপা। চোখ খুলে মিলারেপা দেখলেন, কৈলাস শৃঙ্গের চূড়া ঘিরে রাখা কালো মেঘ ফেটে সূর্যের অস্বাভাবিক এক উজ্জ্বল রশ্মি তাঁর শরীরকে আরো আলোকিত করে রেখেছে। সেই সূর্য রশ্মি অনুসরণ করে বনচুংয়ের অনেক আগেই মিলারেপা পৌঁছে গিয়েছিলেন কৈলাস শৃঙ্গে। নিয়েছিলেন মানসরোবরের দখল।
তবে শৃঙ্গ থেকে ফিরে এসে মিলারেপা বলেছিলেন, কেউ যেন কোনো দিন এই শৃঙ্গে আরোহণের চেষ্টা না করে। তাদের মতে, কৈলাস শৃঙ্গে বিশ্রাম নিচ্ছেন স্বয়ং ভগবান। তাই সেখানে মানুষ গিয়ে যেন বিরক্ত না করে। আজ পর্যন্ত কোনো পর্যটক, বিজ্ঞানী কিংবা স্যাটেলাইট কৈলাসের চূড়ায় পৌঁছানোর রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি। এমনকি চূড়ায় আরোহণের জন্য কোনো প্রকার সূত্রও আজো রয়ে গেছে অনাবিস্কৃত।
রাশিয়ান বিজ্ঞানীরা যখন তিব্বতের মন্দিরের ধর্মগুরুদের সাথে দেখা করেছিলেন, তখন তারা বলেছিলেন, কৈলাস পর্বতের চারপাশে একটি অতিপ্রাকৃত শক্তি প্রবাহিত রয়েছে। যেখানে সন্ন্যাসীরা তাদের গুরুদের সঙ্গে টেলিপ্যাথিক যোগাযোগ করে।
জানা যায়, এ পর্যন্ত যত মানুষ কৈলাস পর্বতে ওঠার চেষ্টা করেছেন, তাদের সঙ্গেই ঘটেছে অতিপ্রাকৃত ঘটনা। কিছুক্ষণ পরেই তাদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাজ করা বন্ধ করে দেয়। অকাল বার্ধক্য চলে এসেছে শরীরে। সেখানে সাধারণত মানুষের নখ, চুল যে হারে বাড়ে, কৈলাস পাহাড়ে অন্তত ১২ ঘন্টা কাটালে এর বৃদ্ধির হার দ্বিগুণ হয়ে যায়।
রাশিয়ার চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডক্টর আর্নেস্ট মুলডাশেভ ১৯৯৯ সালে ইতিহাসবিদ, পদার্থবিদ ও ভূতত্ত্ববিদের এক বিশাল দল নিয়ে কৈলাস পর্বতে গিয়ে কয়েক মাস কাটিয়েছিলেন। সেখানে থাকাকালীন কিছু অস্বাভাবিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল এই দলটি। দেশে ফিরে ডক্টর মুলডাশেভ জানিয়েছিলেন, রাতের অন্ধকারে কৈলাসের রূপ পাল্টে শরীর শীতল করা এক আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে কৈলাস থেকে। সেই আওয়াজটি অবিকল যেন ‘ওঁম শব্দ।
কৈলাসে গেলে ওই ‘ওঁম ধ্বনি অবিরাম ধ্বনিত হয়। অনেকেই মনোযোগ দিয়ে শুনে দেখেছেন এই ধ্বনিটি ডমরু বা ‘ওঁ’ ধ্বনির মতো। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি বরফ গলে যাওয়ার শব্দ হতে পারে। এমনও হতে পারে যে, আলো এবং শব্দের মধ্যে এমন মিথষ্ক্রিয়া আছে যার কারণে এখান থেকে ‘ওঁম ধ্বনি শোনা যায়।
নাসার বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এখানে চৌম্বক শক্তির কারণেই এমনটা হতে পারে। এখানে চৌম্বকীয় শক্তি আকাশের সাথে মিলিত হয়ে বহুবার এ ধরনের রঙ তৈরি করতে পারে। কিন্তু তাদের এই মতের সত্যতার কোন প্রমাণ দেননি। পুরাণ অনুযায়ী, কৈলাস পর্বতের চারপাশ স্ফটিক, চুনি, সোনা এবং লাপিস লাজুলি দিয়ে গঠিত। এর চারদিকে রয়েছে চারটি প্রাণীর মুখাবয়ব। এর উত্তরে সিংহের মুখ, দক্ষিণে ময়ুরের ও পূর্ব এবং পশ্চিমে হাতির মুখ রয়েছে। আর এইসব রহস্যের ব্যাখ্যা এখনো অমীমাংসিত।
